এই বলে বসন্ত আবার বলল
By -
March 01, 2024
0
এই জীর্ণশীর্ণ ভেঙে পড়া শরীরের মানুষটা হলো বসন্ত। বয়সের ভারে আর নিত্য দিনের অভাবের তাড়নায় দুটো চোয়াল গর্তের সৃষ্টি করে ঢুকে পড়েছে মুখের ভিতর। বসন্ত এই গ্রামের ই এক হতদরিদ্র গরীব চাষী। নিজের বলতে খুব সামান্য জমি। সেখানে দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে কিছু সব্জির চাষ করে । নিজের জমির সব্জি তুলে নিয়ে ভোর বেলা ঝুড়ি ভর্তি করে মাথায় করে চলে বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিমি দূরে এক হাটে। সেখানে এক কোনে বসে সব্জির বেচাকেনা করে বসন্ত। সকাল বেলা তথাকথিত সব ধরনের মানুষের খুব ভিড় ডাক্তার শিক্ষক উকিল ব্যবসায়ী আর সাধারণ মানুষের ভীড় তো বটেই।বসন্তের একদম টাটকা ক্ষেত থেকে তোলা সব্জির কদর ও খুব বেশি। এক উকিল বসন্তের কাছে সব্জি প্রায় দিন ই নেই। তবে সেই দরদাম করতে ছাড়ে না। উকিল বাবু হাসতে হাসতে এসে বললেন- কি রে বসন্ত আজ কি এনেছিস?
বসন্ত দ্রুত বললো-এই যে কত্তাবাবু বেগুন আছে, পালংশাক আছে মুলো আর সিম আছে বাবু। কি লাগবো কওন বাবু?
উকিল - অল্প অল্প করে বেছে বেছে সব কিছুই দে রে বসন্ত। তোর সব্জি বাড়ির সব মানুষের খুব পছন্দ বুঝলি বসন্ত। তাই দুই কেজি খাঁসির মাংস নেওয়ার পরও তোর সব্জি নিতে হচ্ছে। উকিলের কথা শুনে বসন্তের ভাঙা চোয়ালে নিস্পাপ হাসি ফুটে উঠে। হাসতে হাসতে বসন্ত বলে-সে তো পছন্দ হবেই বাবু ক্ষেত থেকি যে সোজা বাজারে চলি আসি, এক্কেরে টাটকা সব্জি বাবু।
এই বলে বসন্ত আবার বললো- এই লন বাবু আপনার সব্জি, ব্যাগখানা দ্যান দেহি সব্জি গুলা ভইরে দিই বাবু।
বসন্ত ব্যাগ টি হাতে নিয়ে সব্জি ভরতে ভরতে বললো -আপনার হইলো গিয়া চল্লিশ টাকা।
উকিল বাবু টাকা দিতে দিতে বললো-এতো দাম কেন রে বসন্ত? ত্রিশ টাকা নে।। রোজ রোজ তোর কাছেই তো সব্জি নিয়ে থাকিরে বেটা।এতো দাম নিলে হয়। টাকা কোথা থেকে আসে বল তো দেখি। আর তাছাড়া সব্জি তো তোর নিজের ক্ষেতের অসুবিধা কোথায় বল?বসন্ত মাথা নিচু করে কিছু না বলে ত্রিশ টাকা নিয়ে কুড়ি টাকা উকিল বাবু কে ফিরিয়ে দিলো। উকিল বাবু বসন্তের ভাঙা শরীর, শুকনো মুখের দিকে হয়তো দেখেও দেখলোনা উপর থেকে এক গাল হেসে চলিরে বসন্ত বলে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। আর বসন্তের শূন্য দৃষ্টি নতুন ক্রেতার সন্ধানে অপেক্ষা করতে লাগলো।
উকিল বাবু বসন্তের সব্জি কিনে চল্লিশ টাকায় দিতে পারতেন, আর দশ টাকা খুশি হয়ে দিয়ে বলতে পারতেন যা বসন্ত ঐ বাকি দশ টাকার চা বিস্কুট খেয়ে নিস তুই। যে মানুষ টা দুই কেজি খাঁসির মাংস খেতে পারে সেই মানুষি চল্লিশ টাকার সব্জি কিনে দরদাম করে ত্রিশ টাকা দেয়। মাংস কেনার সয় পাঁচ পয়সা কমানোর কথাও কিন্তু বলেনি ঐ মানুষ টা। দুর্বল কে হারিয়ে বড়ো হবার আনন্দ উপভোগ করা শুধু সবলেরই থাকে হয়তো। গরিব মানবিক মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে সর্বশান্ত হয়ে যায় একদিন। গরীব এই ভাবেই মরে আর বাঁচিয়ে রাখে এমন হাজার হাজার উকিল বাবু তথা সমাজের ভদ্রলোকের অট্টালিকার রৌনক।

